JOMIDAR BARI
রাত্রি দ্বী প্রহর। জীবনযাত্রার শুনশান নিরবতা।মাঝে মাঝে কয়েকটি শিয়ালের ডাক ভেসে আসছে।বড় অদ্ভূত গ্রামটা।ওইদিকে আজ আবার কৃষ্ণপক্ষের ২য় দিন।চারদিক অন্ধকারে আচ্ছন্ন।খুব একটা ভালো দেখা যায় না।
গায়ের উচু নিচু পথ পেরিয়ে এগোনো প্রায় অসম্ভব হয়ে যাচ্ছে।এমনিতেই গ্রীষ্মের শেষের দিক।তার উপরে রাতে সাপ-কোপের ভয়;সবমিলিয়ে একটা লোমহর্ষক ব্যাপার। এই গ্রাম তো চিনি না আজই প্রথম পা পড়লো এখানে। তার সাথে রাস্তা হারানোর ব্যাকুলতা।এই ঘন জঙ্গলের ভিতর একটা ছোট্ট রাস্তা ধরে এগোচ্ছি গন্তব্য যেখানে ছিলো সেখানের কাছাকাছি চলে এসেছি না দুরে হারিয়ে যাচ্ছি তা নিয়েও সংশয়। যেভাবেই হোক এই জঙ্গল থেকে বের হওয়া চাইই চাই।না হয় আজ কোন ভয়ানক জন্তুর পেটে চলে যাবো নিশ্চিত।ওহ পিছনে তাকানোই যাচ্ছেনা ভয়ানক অন্ধকার ;আমি আর ভাবতে পারছি এখান থেকে বের হতে পারলেই বাঁচি। কোথা হতে একটা চাপা আওয়াজ আসছে মনে হলো।আরে এটা ভুতুম পেচা। এই বিদঘুটে অন্ধকারে পেচা আসবে কোত্থেকে ; সম্ভবত বাদুর।
এইতো সামনে একটা বাড়ি দেখা যাচ্ছে।ভিতর থেকে প্রদীপের নিভু নিভু আলো আসছে।বাড়িটা জনমানব শুন্য মনে হচ্ছে।বাড়িটা পুরোনো আমোলের চারদিকে লতাপাতা ঘেরা। কিছু লতা সাপের মতো উপরে উঠে গেছে।বাড়িটা দেখে কৌতুহলী হলাম। আবার ভয়ও করছে,গায়ে কাঁটা দিচ্ছে,লোমগুলো খাড়া হয়ে যাচ্ছে। লোমহর্ষক কিছুর কৌতুহল নিয়ে বাড়ির ছোট্টো গেট ঠেলে ঢুকলাম। বাড়ির বাইরের পরিবেশ আর ভিতরের পরিবেশ সম্পূর্নই আলাদা।চারদিকে ঘেরা বাড়ি মধ্যখানে উঠান। বাড়ির দুটি কক্ষ থেকে আলোক রশ্মি ঠিকরে বেরিয়ে আসছে।
সহসা সচকিত হয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে বললাম,
"ভিতরে কেউ আছেন "তিনবার বললাম।। কিন্তু ভিতর থেকে কোনো সারাশব্দ নেই।ভয়টা ক্রমশ বারছে। আমি রীতিমত ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছি।হঠাৎ কারো পায়ের আওয়াজ শুনতে পেলাম।আওয়াজটা ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে।
আমার সামনে একটা বৃদ্ধ লোক দাড়ানো।হাতে একটা হাটার লাঠি।অনুমান করলাম বয়স ৭০-৮০ এর কাছাকাছি হবে।আমাকে থ হয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞাস করলো....
"কে বাবা তুমি?পথ হারিয়ে এখানে এসেছো?"
--আমি তাজ।পথ হারিয়েছি না পেয়েছি তা নিশ্চিত নয়। বাড়িটা ভালো লাগলো তাই ঢুকলাম।একটু জল হবে?
জল খাইবেন
একটু দাড়ান বাবা।
এটুকু বলেই তিনি হাক ছাড়লেন..
"মা চন্দনা একটুখানি জল নিয়ে আয়তো।"
ভিতর থেকে একটা মেয়েলী কন্ঠ ভেসে উঠলো ""আসছি বাবা""
বৃদ্ধ লোকটি আমাকে একটা বেতের মোড়া দেখিয়ে বসার নির্দেশ করলো।আমার ভীত অবস্থা এখন আর নেই।।এর ভিতর নুপুরের ঝংকার শুনলাম।এক অল্প রয়স্কা নারী মূর্তি আমার সামনে দাড়ানো হাতে এক পেয়ালা জল।ঘোমটা টানা, চেহারাটা স্পষ্ট নয়। মন বলছে এই চন্দনা।
জল পানের পর। বৃদ্ধ লোকটির সাথে আলাপ শুরু করলাম।
আপনার নাম?
-রইস আলী।
আপনিতো অনেক পুরানো আমলের লোক। এই বাড়িটা আপনার?
-নাহ। হরপদ জমিদারের। আমি তার লেঠেল বাহিনীর প্রধান ছিলাম।
ওও আর ঐ মেয়েটি?
- হরপদ জমিদারের একমাত্র কন্যা।
এতোক্ষনে আমি আর রইস আলী মোড়া ছেড়ে গোল পাতার হোগলায় এসে বসলাম।
এতোক্ষনে মোটামুটি ভালোই সহজ হয়ে গেলাম রইস আলীর সাথে। বারবার মন টানছে ঐমেয়েটির দিকে।ঐ নুপুরের ধ্বনি।
এবার রইস আলী নিজ থেকেই তার ভাঙা ভাঙা কন্ঠ বলা শুরু করলো তার জীবন কাহীনি।ঘুম ঘুম ভাব নিয়ে শুনছিলাম রইস আলীর জীবনের গল্প।
আজ এই জমিদার বাড়ি একসময় হরপদ ব্যানার্জি রাজত্বের কেন্দ্রভুমি। অত্যাচারি শাসক হিসেবে যাকে চেনে এই এলাকার সকলে।।
রইস আলী বলে চলল,
"বাবা মা দুজনকেই হারিয়েছি ছোট বেলায়।জমিজমা সব নদীতে হারিয়ে গেছে।মাইনসের কাছে চাইয়া চিনতে খাইতাম। কেউ আছিলো না দেখার। বড়ই দুর্দিনের মধ্যে ছিলাম।এর ভিতর হঠাৎ একদিন গঞ্জের হাটে গেলাম ভিক্ষা করতে।
এক লোকরে গিয়ে বললাম "আম্রে দুইডা ট্যাহা দ্যান দুই দিন যাইত কিছু খাইনাই।"
লোকটা আমারে নিয়া অনেক কিছু খাওয়াই লো। বলল "তোর কে কে আছে বাড়িতে?"
-কেউ নাই।
:বাবা -মা?
-না ফেরার দেশে।
ওওও। তার পর আমারে কিছুক্ষন সান্ত্বনা দিয়া বলল,"যাবি আমার সাথে?"
যেহেতু আমার কেউ ই ছিলো না ধারায় তাই রাজি হইয়া গেলাম।
স্রষ্টা যেনো মুখ তুলে চাইলেন।আমার আর আগের মতোন ভিক্ষা করতে হয় না। দু বেলা দুমুঠো খাবার পেতাম। ভালোই চলছিলো।যেই বাবুর সাথে আাসছিলাম ওনার নাম তারাশঙ্কর। কৃষিজীবী- বর্গা চাষী...
এছাড়াও তার একটা ব্যাবসা ছিলো।সব মিলিয়ে ভালোই চলছিলো।কিন্তু কথা আছে না "অভাগা যেখানে যায় সেখানে সাগর শুকিয়ে যায়।"
বাবু রা তিনজন আমায় নিয়ে তাদের পরিবারে সদস্যসংখ্যা মাত্র চার।বাবু র কোনো ছেলে ছিলো না বিধায় বাবুর স্ত্রী আমাকে খুব পছন্দ করতেন।
এইবার আসি সংসারের প্রিয় সদস্যের কথা।
আমি বুবু বলে ডাকতাম।ভালো নাম প্রিয়দর্শিনী। আমাকে নিজের ছোট ভাইয়ের মতো আদোর করতো।আমারসাথে ঘুরতো, আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে বুবু।ঘুড়ি উড়ানো থেকে শুরু করে। অন্যের গাছের আম চুরি করা পর্যন্ত।
-"কি হাসতেছেন?"
ঘুম ঘুম অবস্থা য় ছিলাম রইস আলীর সচকিত জিজ্ঞাসায় প্রান ফিরে পেলাম। স্বব্যাস্থ হয়ে বললাম "নাহ আপনি বলুন?"
-আপনি এই গ্রামের কোথায় যাবেন?
:এখানে আমার বাবার এক বন্ধু থাকে।সোমনাথ সরকার।ওনাদের বাড়িতে যাবো।
-সরকার বাড়ি?
:হ্যা.এখান থেকে কত দুর?
-এই একটা গ্রাম পেরলেই।মেইনরাস্তা দিয়া সোজা গিয়া বায়ে কিছুক্ষন হাটলেই সরকার বাড়ি।
:ওও।আচ্ছা।বললাম একটু জল হবে?(উদ্দেশ্য জল নয় উদ্দেশ্য সেই নুপুরের ঝংকার শোনা। কেমন একটা মায়া কাজ করে)
রইস আলী বলল,"মা চন্দনা একটু জল দিয়ে যা।"
কিন্তু সে আর এলোনা। ঘুমিয়ে পড়েছে হয়তো।
আমি বললাম, কি যেনো বলছিলেন আপনার বুবুর কথা।
রইস আলী আবার বলা শুরু করলো।
হ্যা।বুবুর সাথে সাথে ছায়ার মতো থাকতাম।একসাথে আম চুরি।রোদে শুকো দেয়া আচার কত খেয়েছি মনে নেই।কিন্তু.......
রইস আলী একটা নিঃশ্বাস নিলেন।
-আমি বল্লাম কিন্তু কী? থামলেন কেনো? কি হয়েছিলো আপনার বুবুর।.... কতগুলো প্রশ্ন করে কৌতুহলি দৃষ্টি তে তাকিয়ে রইলাম।
দেখলাম রইস আলীর চোখ অশ্রু সজল হয়ে উঠেছে।
কিছুটা সময় নিয়ে তিনি বলা শুরু করলেন।
"সেবার বাবুর ব্যাবসায় ধ্বস নামলো।ওদিকে খরার কারনে ক্ষেতের ফলন ও ভালো না।
ওদিকে হরপদ জমিদারের গোমেস্তারা খাজনার জন্য বারবার তাগাদা দেয়া শুরু করলো।সংসারের এমন দুর্দিনে আমাকে আর বুবুকে পাঠিয়ে দেয়া হলো বুবুর এক দুঃসম্পর্কীয় দিদার বাড়ি।
সেখানে মোটামুটি ভালোই চলছিলো।মাঝে আমি আর বুবু বাবুদের বাড়িতে এসে দেখা করে যেতাম।দু একদিন থাকাও হতো মাঝে মাঝে।
এভাবে একমাস পেরেই গেলো। সেবার এসে তিন দিন থেকেছিলাম। তৃতীয় দিনে গোমেস্তা সহ হরপদ জমিদার হাজির হলো।নানা বাগবিতান্ডের মধ্যে শেষ পর্যন্ত বাবুরই হার হলো।বর্গাচাষী খাজনার টাকা বাকী।কিছুই করার রইলো না।
বাবুর সাদা কাগজে টিপ সই নিলো।এই টিপসই ই বাবুর কাল হয়ে দাড়ালো।এই টিপসইয়ের ঘোলাজলে বাবুর ভিটে মাটি সব কেড়ে নিলো হরপদ ব্যানার্জি।রক্ষা পায়নি প্রিয়দর্শীনি বুবুও
প্রিয়দর্শীনি বুবু সুন্দরী ও মায়াবতী।এই সৌন্দর্য হরিপদ বাবুর নারীলিপ্সু চোখ ও এড়ালো না।
একদিন রাতে তারাশঙ্কর বাবু বাড়ি ফেরার পথে জমিদারের লোকেরা তাকে নির্মম ভাবে হত্যা করে।কারন একটাই; তিনি প্রিয়দর্শীনিকে জমিদারের রংমহলে পাঠাতে নারাজ ছিলেন।
স্বামী শোক বেশীদিন সইতে পারলেন না তারাশঙ্কর বাবুর স্ত্রী।
ভবধারায় বাকী রইলাম আমি আর প্রিয়দর্শীনি বুবু।তাও পারলাম কই?
কিছুদিন পর জমিদারের লোকেরা এসে বুবুকে তুলে নিয়ে যায়। আর একটা দলিলে টিপসই দেখিয়ে তারাশঙ্কর বাবুর ভিটে মাটি দখল করে নেয়।আমি আবার সেই পথের মুসাফির।
আমার স্থান হয় রাস্থায়। আর প্রিয়দর্শীনি র স্থান হয় জমিদারের রংমহলে।
"এই সেই রংমহল"বলেই দেখালো আমাকে জমিদারের রংমহল।
এই রংমহলের সাথে মিশে অনেক নারীর স্মৃতি।অনেক নারীকে এই রংমহলে নারীলিপ্সু হরপদ ব্যানার্জির নীল চোখের দংশনে দংশিত হতে হয়েছে।
প্রিয়দর্শীনি যেই পায়ে সকালের শিশির ভেজার উষ্ণতা লাগাতো সেই পায়ে পরিয়ে দেয়া হলো নাচনেওয়ালীর ঘুঙুর।
আমি তারাশঙ্কর বাবুর বাড়ি থেকে চলে এলেও বুবুর সাথে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করতাম। অবশেষে একদিন বুবুর দেখা মিললো।আমাকে দেখেই কান্নায় ভাঙে পড়লো।"আমাকে এই নরক থেকে নিয়ে চল ভাই" বলেই হাউ মাউ করে কাদতে লাগলো।একদিন রাত্রে পরিকল্পনা মাফিক বুবু হরিপদ কে শরবের নেশায় মত্ত রেখে রংমহল থেকে বেরিয়ে আসলো। আমি বুবুকে নিয়ে গ্রাম ছেরে অন্য গ্রামে চললাম।সেখানে আবার ঘর বাধলাম। বুবু সারাদিন মনমরা হয়ে থাকতো দেখতে দেখতে বুবুর কোল আলোকিত করে আসলো চন্দনা।লোকলজ্জার ভয়ে বুবুও আর বেশীদিন রইলে না। সেদিন সন্ধ্যা বেলা মজুর কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরতেই বুবু আমায় বললো"আমি না থাকলে তুই চন্দনাকে দেখিস ভাই।"
আমি বুবুকে রাগ দেখিয়ে বললাম "অমন বজে বক না বুবু।"
→তার মানে চন্দনা?
: হ্যা।চন্দনা প্রিয়দর্শীনির মেয়ে।হরিপদের ঔরসজাত কন্যা।
→তারপর।
: রইস আলী গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে বলে চলল,সকাল বেলা উঠে বুবুকে কোথায়ও খুজে পেলাম না। পরেরদিন বুবুর শবদেহ লাল দিঘিতে ভেসে উঠলো।
কিছুদিন আগেও আমার সব ছিলো আজ আমি নিঃস্ব।তারপরেও বুবুদের মায়া ছাড়তে পারলাম না।চন্দনাকে নিয়ে ফিরে এলাম আবার হরিপদের এলাকায়।হরিপদকে উচিত শিক্ষা দিতে।
কিন্তু বড় মাছ কুলে উঠানো যেমন কঠিন জালে বাজানো আরো কঠিন।
চন্দনাকে বড় করতেছিলাম আপন মনে। বুবুকে দেওয়া কথা হেরফের হবার নয়।আমার মতে বুবু, তারশঙ্কর বাবু এবং তার স্ত্রী হত্যার জন্য হরিপদই দায়ী।
চন্দনাকে বড় করছিলাম আর মনের ভিতর হরিপদের উপর প্রতিশোধের ছক কষছিলাম।
কায়দা করে প্রথমে হরিপদের বাড়ির মালীর কাজটা জুটিয়ে নিলাম। দীর্ঘ্য পাঁচ বছরের সাধনাশ আস্তে আস্তে হরিপদের বিশ্বাস অর্জন করলাম। মালী থেকে লেঠল, লেঠেল থেকে লেঠল সর্দার। এবং একেবারে খাস লোক।
খাস লোক হওয়ায় হরপদ ব্যানার্জির অনেক পৈচাশিক কার্যের স্বাক্ষী ছিলাম।
চন্দনার মা বাবা বলতে সবই আমি।দেখতে দেখতে চন্দনা দশ পেরিয়ে এগারোয় পা রাখলো।এটা তৎকালীন হিন্দু মেয়েদের বিয়ের উপযুক্ত বয়স।চন্দনার মুখের দিক তাকিয়ে ভুলে যাই হরপদের উপর প্রতিশোধের স্পৃহা।
চন্দনা দেখতে একেবারে ওর মা প্রিওদর্শীনির মতো।ওর মুখের পানে চাইলে ভেসে উঠতো বুবুর মুখখানা।
সব কিছু ঠিকঠাকই চলছিলো।
কিন্তু হঠাৎ একদিন আচমকা ঝড় এসে সব ওলট পালট করে দিয়ে গেলো।
→ ঝড়?
: হুম।। বলে রইস আলী আবার বলা শুরু করলো।
চন্দনা প্রিয়দর্শীনির মতো চঞ্চলা।সারাক্ষন বনে বাদরে ঘুরে বেড়াতো।আমি কখনো নিষেধ করিনি।কারন ওর ভিতর আমি প্রয়দর্শীনি বুবুকে দেখতাম।
হু বলে একটা দীর্ঘস্বাস ফেললো রইস আলী।
আাবার বলা শুরু করলো,:
সেদিন হরিপদ ব্যানার্জি বের হলেন প্রাতঃভ্রমনে বরাবরের মতো এবারও আমি তার সাথে বের হলাম।সাথে কয়েকজন গোমেস্তা।
উত্তর পারা পেরিয়ে একটু মোর নিতেই চন্দনা এসে পড়লো হরপদ ব্যানার্জির সামনে।
চন্দনা সামনে থেকে দৌড়ে চলে গেলো ওর সই দের সাথে।
কিন্তু এই স্বল্পসময় হরপদ ঠিকই চন্দনাকে দেখেফেলেছিলো।
হরপদ ব্যানার্জি সহসা জিজ্ঞাসা করলো :
- মেয়েটা কে? আগেতো কখনো দেখিনি এই গাঁয়ে।
হরপদের এই কথা শুনেই আমার বুকের ভিতর হু হু করে উঠলো।মনে এক অজানা আকস্মিক ভয় দানা বাধতে শুরু করলো।মনে হলো আমি হারিয়ে ফেলবো চন্দনাকে।
এর ভিতর এক গোমাস্তা বলে উঠলো। ওর নাম চন্দনা।রইস আলীর মেয়ে।
হরপদ: রইস আলী তুমিতো বিয়ে করোনি। মাইয়া পাইলা কই।
গোমেস্তাদের মধ্যে একটা হাসির রোল পরে গেলো। মানুষের দুঃখ কেউ দেখেনা। কিন্তু তামাশা দেখার নেশা এক বড় নেশা।
→আসলে আমার বুবুর মেয়ে।। মা মরা মেয়ে।
: কাইলকার নিয়া আইসো দেখি কি রকম লালন পালন করছো।
আবার হাসিরর রোল পড়লো গোমেস্তা দের মধ্যে।
আমি কোনো কথা না বলে ওখান থেকে বাড়ির পথ ধরলাম।বুবুর ঘটনার পরও ঐ চন্দনার মুখের দিকে তাকিয়ে হরপদ ব্যানার্জির সব প্রতিশোধ ভূলে ছিলাম।
কিন্তু এতো দিন কারর চুপসে থাকা শ্মশানচারী মনে আবার প্রতিশোধের দানা বাধতে থাকলো।
বাবা হয়ে নিজের মেয়ের দিকে কু দৃষ্টি।রক্ত টগবগ করছে। হরপদের এই অত্যাচার আর চলতে দেয়া যাবে না। এসব ভাবতে ভাবতে বাড়ির সামনে এসে পড়লাম।মাথা টখনো টগবগ করছে আমি রাগে কাল নাগের মতো ফুসছি।
দেউরীতে গিয়েই রাগের সহিত হাক ছাড়লাম "চন্দনা"
সাথে সাথে চন্দনা বেরিয়ে এলো।
সজোরে একটা চর মারলাম ওর গালে।এই দীর্ঘ্য পনের বছরের ভিতর একবারও ওর গায়ে হাত তুলিনি।করিনি কোনো শাসনও।আজই তুললাম......নিজের কাছে নিজেকে খুব ছোটো মনে হলো।দেখলাম হাতের পাচটি আঙুলের ছাপ ওর গালে পরে গেছে।ওর চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পরতেছে।।ও দৌরে ঘরের ভিতর চলে গেলে।
আমি প্রিয়দর্শীনিকে হারিয়েছি কিন্তু ওকে হারালে আমি কি নিয়ে বাঁচবো।
তাই স্থির করলাম কালল সূর্যোদয়ের পূর্বেই চন্দনাকে নিয়ে গ্রাম থেকে পালিয়ে যাবো।চন্দনার ঘরে গিয়ে দেখি ও তখনো কাঁদছে।।
গিয়া চন্দনার পাশে বসতেই ও আমার বুকে মাথা গুজে আরো কান্না করতে লাগলো।ওকে স্বান্তনা দেয়ার,ভাষা হারিয়ে ফেলেছি।
আস্তে আস্তে ওকে বললাম চল মা আমরা এই গ্রাম থেকে অন্য কোথায়ও পালিয়ে যাই।
"কেনো?" বলে সেই মায়াবী মুখটা আমার পানে চেয়ে রইলো।একটু আগে ঘটে যাওয়া সমস্ত ঘটনা ওকে খুলে বললাম।
চন্দনা বলল:ও তো বুইড়া। কিন্তু এতো খারাপ কেনে?
এই বার চন্দনাকে ওর মা প্রিয়দর্শীনির সর্বনাশের কাহীনি শুনালাম।ওকে যখন বললাম যে ওর মায়ের সর্বনাশ করেছে ওই হরপদ ব্যানার্জি এবং ওনি চন্দনার বাব।
চন্দবা বলল:আমার বাবা ওই নরপশু কোনোদিনই হতে পারে না।
এসব কথা ছাড় মা। তারাতারি মালপত্র গুছিয়ে নে। কালকে সূর্যদয়ের পূর্বেই এই গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে হবে।
চন্দনা উঠে দাড়ালো ওর মুখে প্রতিশোধের স্পষ্ট চিহ্ণ দেখতে পাচ্ছি।চন্দনা আরো দৃঢ় হয়ে বলল "গ্রাম তো ছাড়বোই তার আগে আমার মায়েরর সর্বনাশের বদলা নিবো।আজ রাতেই হরপদের জীবনের শেষ রাত।"
এরকম বলিস না মা। হরপদ অনেক শক্তিশালী ওর সাথে লাগা আমাদের মতো গরীব মাইনসের খাটে না।
:নাহ বাবাই। ওই নরপিচাশ কে না মারতে পারলে আমার মায়ের আত্মা কোনোদিনও শান্তুি পাবেনা।
ওর কথা শুনে আমার গায়ের রক্ত টগবগ করে ফুটতে ছিলে আর মে পরতেছিলো বুবুর শেষ কথা গুলো ।
→ দেখ মা আমার জীবনে আকড়ে ধরার মতো তুই ছাড়া কেউ নেই।তুই এগুলো ছাড় মা। তারাতারি সব মালপত্র গুছিয়ে ফেল।
:না বাবাই।
চন্দনাকে গ্রাম থেকে পালানোর কথা শেষ পর্যন্ত মানাতে পারলাম না।সে স্থির করলো আজকেই সে জমিদারের রঙ মহলে যাবে।এজন্য কিছু বিষ জোগার করলো যা আজকে জমিদারকে নেশার ঘোরে খাওয়াবে।আমার শত বাধা ও মানলো না। প্রিয়দর্শীনির মতো ও আজ ঘুঙুর পড়লো।ঘুঙুর পরে যখন হাটছে তখন ঝুম ঝুম ঝুম নিপ্পন ধ্বনি ছড়িয়ে পড়লো চারদিক।চন্দনাকে নিয়ে আাশার কারনে জমিদার হররপদ ব্যানার্জি আমাকে কিছু উপঢৌকন দিলো।চন্দনাকল আজ অনেকটা রহস্যময়ী লাগছে। মনে হলো এই চন্দনাকে আমি চিনি না।মনের মধ্যে এক অজানা আতঙ্ক। ও পারবে তো কাজটা করতে। নাকি ওরও প্রিয়দর্শীনির মতো অবস্থা হবে।পৃথিবীর কোনো বাবা হয়তো তার মেয়েকে এমন বিপদে ফেলেনি।মনে মনেনে নিজেকে ধিক্কার দিলাম।ওকে পূর্বের ঘটনা না বলে অন্য কোনো ভাবে বলে কয়ে ওকে নিয়া গ্রাম ছেড়ে পালাতে পারতাম। আমি কাঁদছি যা কেউ শুনতে পেলো না।
সেদিন রংমহলে চন্দনার নিপ্পন ধ্বনি প্রথম বাররের মতো বেজেছিলো যেনো হরপদ ব্যানার্জির বিদায় ঘন্টা।বলে কাদতে ছিলেন রইস আলী।
গায়ের উচু নিচু পথ পেরিয়ে এগোনো প্রায় অসম্ভব হয়ে যাচ্ছে।এমনিতেই গ্রীষ্মের শেষের দিক।তার উপরে রাতে সাপ-কোপের ভয়;সবমিলিয়ে একটা লোমহর্ষক ব্যাপার। এই গ্রাম তো চিনি না আজই প্রথম পা পড়লো এখানে। তার সাথে রাস্তা হারানোর ব্যাকুলতা।এই ঘন জঙ্গলের ভিতর একটা ছোট্ট রাস্তা ধরে এগোচ্ছি গন্তব্য যেখানে ছিলো সেখানের কাছাকাছি চলে এসেছি না দুরে হারিয়ে যাচ্ছি তা নিয়েও সংশয়। যেভাবেই হোক এই জঙ্গল থেকে বের হওয়া চাইই চাই।না হয় আজ কোন ভয়ানক জন্তুর পেটে চলে যাবো নিশ্চিত।ওহ পিছনে তাকানোই যাচ্ছেনা ভয়ানক অন্ধকার ;আমি আর ভাবতে পারছি এখান থেকে বের হতে পারলেই বাঁচি। কোথা হতে একটা চাপা আওয়াজ আসছে মনে হলো।আরে এটা ভুতুম পেচা। এই বিদঘুটে অন্ধকারে পেচা আসবে কোত্থেকে ; সম্ভবত বাদুর।
এইতো সামনে একটা বাড়ি দেখা যাচ্ছে।ভিতর থেকে প্রদীপের নিভু নিভু আলো আসছে।বাড়িটা জনমানব শুন্য মনে হচ্ছে।বাড়িটা পুরোনো আমোলের চারদিকে লতাপাতা ঘেরা। কিছু লতা সাপের মতো উপরে উঠে গেছে।বাড়িটা দেখে কৌতুহলী হলাম। আবার ভয়ও করছে,গায়ে কাঁটা দিচ্ছে,লোমগুলো খাড়া হয়ে যাচ্ছে। লোমহর্ষক কিছুর কৌতুহল নিয়ে বাড়ির ছোট্টো গেট ঠেলে ঢুকলাম। বাড়ির বাইরের পরিবেশ আর ভিতরের পরিবেশ সম্পূর্নই আলাদা।চারদিকে ঘেরা বাড়ি মধ্যখানে উঠান। বাড়ির দুটি কক্ষ থেকে আলোক রশ্মি ঠিকরে বেরিয়ে আসছে।
সহসা সচকিত হয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে বললাম,
"ভিতরে কেউ আছেন "তিনবার বললাম।। কিন্তু ভিতর থেকে কোনো সারাশব্দ নেই।ভয়টা ক্রমশ বারছে। আমি রীতিমত ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছি।হঠাৎ কারো পায়ের আওয়াজ শুনতে পেলাম।আওয়াজটা ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে।
আমার সামনে একটা বৃদ্ধ লোক দাড়ানো।হাতে একটা হাটার লাঠি।অনুমান করলাম বয়স ৭০-৮০ এর কাছাকাছি হবে।আমাকে থ হয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞাস করলো....
"কে বাবা তুমি?পথ হারিয়ে এখানে এসেছো?"
--আমি তাজ।পথ হারিয়েছি না পেয়েছি তা নিশ্চিত নয়। বাড়িটা ভালো লাগলো তাই ঢুকলাম।একটু জল হবে?
জল খাইবেন
একটু দাড়ান বাবা।
এটুকু বলেই তিনি হাক ছাড়লেন..
"মা চন্দনা একটুখানি জল নিয়ে আয়তো।"
ভিতর থেকে একটা মেয়েলী কন্ঠ ভেসে উঠলো ""আসছি বাবা""
বৃদ্ধ লোকটি আমাকে একটা বেতের মোড়া দেখিয়ে বসার নির্দেশ করলো।আমার ভীত অবস্থা এখন আর নেই।।এর ভিতর নুপুরের ঝংকার শুনলাম।এক অল্প রয়স্কা নারী মূর্তি আমার সামনে দাড়ানো হাতে এক পেয়ালা জল।ঘোমটা টানা, চেহারাটা স্পষ্ট নয়। মন বলছে এই চন্দনা।
জল পানের পর। বৃদ্ধ লোকটির সাথে আলাপ শুরু করলাম।
আপনার নাম?
-রইস আলী।
আপনিতো অনেক পুরানো আমলের লোক। এই বাড়িটা আপনার?
-নাহ। হরপদ জমিদারের। আমি তার লেঠেল বাহিনীর প্রধান ছিলাম।
ওও আর ঐ মেয়েটি?
- হরপদ জমিদারের একমাত্র কন্যা।
এতোক্ষনে আমি আর রইস আলী মোড়া ছেড়ে গোল পাতার হোগলায় এসে বসলাম।
এতোক্ষনে মোটামুটি ভালোই সহজ হয়ে গেলাম রইস আলীর সাথে। বারবার মন টানছে ঐমেয়েটির দিকে।ঐ নুপুরের ধ্বনি।
এবার রইস আলী নিজ থেকেই তার ভাঙা ভাঙা কন্ঠ বলা শুরু করলো তার জীবন কাহীনি।ঘুম ঘুম ভাব নিয়ে শুনছিলাম রইস আলীর জীবনের গল্প।
আজ এই জমিদার বাড়ি একসময় হরপদ ব্যানার্জি রাজত্বের কেন্দ্রভুমি। অত্যাচারি শাসক হিসেবে যাকে চেনে এই এলাকার সকলে।।
রইস আলী বলে চলল,
"বাবা মা দুজনকেই হারিয়েছি ছোট বেলায়।জমিজমা সব নদীতে হারিয়ে গেছে।মাইনসের কাছে চাইয়া চিনতে খাইতাম। কেউ আছিলো না দেখার। বড়ই দুর্দিনের মধ্যে ছিলাম।এর ভিতর হঠাৎ একদিন গঞ্জের হাটে গেলাম ভিক্ষা করতে।
এক লোকরে গিয়ে বললাম "আম্রে দুইডা ট্যাহা দ্যান দুই দিন যাইত কিছু খাইনাই।"
লোকটা আমারে নিয়া অনেক কিছু খাওয়াই লো। বলল "তোর কে কে আছে বাড়িতে?"
-কেউ নাই।
:বাবা -মা?
-না ফেরার দেশে।
ওওও। তার পর আমারে কিছুক্ষন সান্ত্বনা দিয়া বলল,"যাবি আমার সাথে?"
যেহেতু আমার কেউ ই ছিলো না ধারায় তাই রাজি হইয়া গেলাম।
স্রষ্টা যেনো মুখ তুলে চাইলেন।আমার আর আগের মতোন ভিক্ষা করতে হয় না। দু বেলা দুমুঠো খাবার পেতাম। ভালোই চলছিলো।যেই বাবুর সাথে আাসছিলাম ওনার নাম তারাশঙ্কর। কৃষিজীবী- বর্গা চাষী...
এছাড়াও তার একটা ব্যাবসা ছিলো।সব মিলিয়ে ভালোই চলছিলো।কিন্তু কথা আছে না "অভাগা যেখানে যায় সেখানে সাগর শুকিয়ে যায়।"
বাবু রা তিনজন আমায় নিয়ে তাদের পরিবারে সদস্যসংখ্যা মাত্র চার।বাবু র কোনো ছেলে ছিলো না বিধায় বাবুর স্ত্রী আমাকে খুব পছন্দ করতেন।
এইবার আসি সংসারের প্রিয় সদস্যের কথা।
আমি বুবু বলে ডাকতাম।ভালো নাম প্রিয়দর্শিনী। আমাকে নিজের ছোট ভাইয়ের মতো আদোর করতো।আমারসাথে ঘুরতো, আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে বুবু।ঘুড়ি উড়ানো থেকে শুরু করে। অন্যের গাছের আম চুরি করা পর্যন্ত।
-"কি হাসতেছেন?"
ঘুম ঘুম অবস্থা য় ছিলাম রইস আলীর সচকিত জিজ্ঞাসায় প্রান ফিরে পেলাম। স্বব্যাস্থ হয়ে বললাম "নাহ আপনি বলুন?"
-আপনি এই গ্রামের কোথায় যাবেন?
:এখানে আমার বাবার এক বন্ধু থাকে।সোমনাথ সরকার।ওনাদের বাড়িতে যাবো।
-সরকার বাড়ি?
:হ্যা.এখান থেকে কত দুর?
-এই একটা গ্রাম পেরলেই।মেইনরাস্তা দিয়া সোজা গিয়া বায়ে কিছুক্ষন হাটলেই সরকার বাড়ি।
:ওও।আচ্ছা।বললাম একটু জল হবে?(উদ্দেশ্য জল নয় উদ্দেশ্য সেই নুপুরের ঝংকার শোনা। কেমন একটা মায়া কাজ করে)
রইস আলী বলল,"মা চন্দনা একটু জল দিয়ে যা।"
কিন্তু সে আর এলোনা। ঘুমিয়ে পড়েছে হয়তো।
আমি বললাম, কি যেনো বলছিলেন আপনার বুবুর কথা।
রইস আলী আবার বলা শুরু করলো।
হ্যা।বুবুর সাথে সাথে ছায়ার মতো থাকতাম।একসাথে আম চুরি।রোদে শুকো দেয়া আচার কত খেয়েছি মনে নেই।কিন্তু.......
রইস আলী একটা নিঃশ্বাস নিলেন।
-আমি বল্লাম কিন্তু কী? থামলেন কেনো? কি হয়েছিলো আপনার বুবুর।.... কতগুলো প্রশ্ন করে কৌতুহলি দৃষ্টি তে তাকিয়ে রইলাম।
দেখলাম রইস আলীর চোখ অশ্রু সজল হয়ে উঠেছে।
কিছুটা সময় নিয়ে তিনি বলা শুরু করলেন।
"সেবার বাবুর ব্যাবসায় ধ্বস নামলো।ওদিকে খরার কারনে ক্ষেতের ফলন ও ভালো না।
ওদিকে হরপদ জমিদারের গোমেস্তারা খাজনার জন্য বারবার তাগাদা দেয়া শুরু করলো।সংসারের এমন দুর্দিনে আমাকে আর বুবুকে পাঠিয়ে দেয়া হলো বুবুর এক দুঃসম্পর্কীয় দিদার বাড়ি।
সেখানে মোটামুটি ভালোই চলছিলো।মাঝে আমি আর বুবু বাবুদের বাড়িতে এসে দেখা করে যেতাম।দু একদিন থাকাও হতো মাঝে মাঝে।
এভাবে একমাস পেরেই গেলো। সেবার এসে তিন দিন থেকেছিলাম। তৃতীয় দিনে গোমেস্তা সহ হরপদ জমিদার হাজির হলো।নানা বাগবিতান্ডের মধ্যে শেষ পর্যন্ত বাবুরই হার হলো।বর্গাচাষী খাজনার টাকা বাকী।কিছুই করার রইলো না।
বাবুর সাদা কাগজে টিপ সই নিলো।এই টিপসই ই বাবুর কাল হয়ে দাড়ালো।এই টিপসইয়ের ঘোলাজলে বাবুর ভিটে মাটি সব কেড়ে নিলো হরপদ ব্যানার্জি।রক্ষা পায়নি প্রিয়দর্শীনি বুবুও
প্রিয়দর্শীনি বুবু সুন্দরী ও মায়াবতী।এই সৌন্দর্য হরিপদ বাবুর নারীলিপ্সু চোখ ও এড়ালো না।
একদিন রাতে তারাশঙ্কর বাবু বাড়ি ফেরার পথে জমিদারের লোকেরা তাকে নির্মম ভাবে হত্যা করে।কারন একটাই; তিনি প্রিয়দর্শীনিকে জমিদারের রংমহলে পাঠাতে নারাজ ছিলেন।
স্বামী শোক বেশীদিন সইতে পারলেন না তারাশঙ্কর বাবুর স্ত্রী।
ভবধারায় বাকী রইলাম আমি আর প্রিয়দর্শীনি বুবু।তাও পারলাম কই?
কিছুদিন পর জমিদারের লোকেরা এসে বুবুকে তুলে নিয়ে যায়। আর একটা দলিলে টিপসই দেখিয়ে তারাশঙ্কর বাবুর ভিটে মাটি দখল করে নেয়।আমি আবার সেই পথের মুসাফির।
আমার স্থান হয় রাস্থায়। আর প্রিয়দর্শীনি র স্থান হয় জমিদারের রংমহলে।
"এই সেই রংমহল"বলেই দেখালো আমাকে জমিদারের রংমহল।
এই রংমহলের সাথে মিশে অনেক নারীর স্মৃতি।অনেক নারীকে এই রংমহলে নারীলিপ্সু হরপদ ব্যানার্জির নীল চোখের দংশনে দংশিত হতে হয়েছে।
প্রিয়দর্শীনি যেই পায়ে সকালের শিশির ভেজার উষ্ণতা লাগাতো সেই পায়ে পরিয়ে দেয়া হলো নাচনেওয়ালীর ঘুঙুর।
আমি তারাশঙ্কর বাবুর বাড়ি থেকে চলে এলেও বুবুর সাথে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করতাম। অবশেষে একদিন বুবুর দেখা মিললো।আমাকে দেখেই কান্নায় ভাঙে পড়লো।"আমাকে এই নরক থেকে নিয়ে চল ভাই" বলেই হাউ মাউ করে কাদতে লাগলো।একদিন রাত্রে পরিকল্পনা মাফিক বুবু হরিপদ কে শরবের নেশায় মত্ত রেখে রংমহল থেকে বেরিয়ে আসলো। আমি বুবুকে নিয়ে গ্রাম ছেরে অন্য গ্রামে চললাম।সেখানে আবার ঘর বাধলাম। বুবু সারাদিন মনমরা হয়ে থাকতো দেখতে দেখতে বুবুর কোল আলোকিত করে আসলো চন্দনা।লোকলজ্জার ভয়ে বুবুও আর বেশীদিন রইলে না। সেদিন সন্ধ্যা বেলা মজুর কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরতেই বুবু আমায় বললো"আমি না থাকলে তুই চন্দনাকে দেখিস ভাই।"
আমি বুবুকে রাগ দেখিয়ে বললাম "অমন বজে বক না বুবু।"
→তার মানে চন্দনা?
: হ্যা।চন্দনা প্রিয়দর্শীনির মেয়ে।হরিপদের ঔরসজাত কন্যা।
→তারপর।
: রইস আলী গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে বলে চলল,সকাল বেলা উঠে বুবুকে কোথায়ও খুজে পেলাম না। পরেরদিন বুবুর শবদেহ লাল দিঘিতে ভেসে উঠলো।
কিছুদিন আগেও আমার সব ছিলো আজ আমি নিঃস্ব।তারপরেও বুবুদের মায়া ছাড়তে পারলাম না।চন্দনাকে নিয়ে ফিরে এলাম আবার হরিপদের এলাকায়।হরিপদকে উচিত শিক্ষা দিতে।
কিন্তু বড় মাছ কুলে উঠানো যেমন কঠিন জালে বাজানো আরো কঠিন।
চন্দনাকে বড় করতেছিলাম আপন মনে। বুবুকে দেওয়া কথা হেরফের হবার নয়।আমার মতে বুবু, তারশঙ্কর বাবু এবং তার স্ত্রী হত্যার জন্য হরিপদই দায়ী।
চন্দনাকে বড় করছিলাম আর মনের ভিতর হরিপদের উপর প্রতিশোধের ছক কষছিলাম।
কায়দা করে প্রথমে হরিপদের বাড়ির মালীর কাজটা জুটিয়ে নিলাম। দীর্ঘ্য পাঁচ বছরের সাধনাশ আস্তে আস্তে হরিপদের বিশ্বাস অর্জন করলাম। মালী থেকে লেঠল, লেঠেল থেকে লেঠল সর্দার। এবং একেবারে খাস লোক।
খাস লোক হওয়ায় হরপদ ব্যানার্জির অনেক পৈচাশিক কার্যের স্বাক্ষী ছিলাম।
চন্দনার মা বাবা বলতে সবই আমি।দেখতে দেখতে চন্দনা দশ পেরিয়ে এগারোয় পা রাখলো।এটা তৎকালীন হিন্দু মেয়েদের বিয়ের উপযুক্ত বয়স।চন্দনার মুখের দিক তাকিয়ে ভুলে যাই হরপদের উপর প্রতিশোধের স্পৃহা।
চন্দনা দেখতে একেবারে ওর মা প্রিওদর্শীনির মতো।ওর মুখের পানে চাইলে ভেসে উঠতো বুবুর মুখখানা।
সব কিছু ঠিকঠাকই চলছিলো।
কিন্তু হঠাৎ একদিন আচমকা ঝড় এসে সব ওলট পালট করে দিয়ে গেলো।
→ ঝড়?
: হুম।। বলে রইস আলী আবার বলা শুরু করলো।
চন্দনা প্রিয়দর্শীনির মতো চঞ্চলা।সারাক্ষন বনে বাদরে ঘুরে বেড়াতো।আমি কখনো নিষেধ করিনি।কারন ওর ভিতর আমি প্রয়দর্শীনি বুবুকে দেখতাম।
হু বলে একটা দীর্ঘস্বাস ফেললো রইস আলী।
আাবার বলা শুরু করলো,:
সেদিন হরিপদ ব্যানার্জি বের হলেন প্রাতঃভ্রমনে বরাবরের মতো এবারও আমি তার সাথে বের হলাম।সাথে কয়েকজন গোমেস্তা।
উত্তর পারা পেরিয়ে একটু মোর নিতেই চন্দনা এসে পড়লো হরপদ ব্যানার্জির সামনে।
চন্দনা সামনে থেকে দৌড়ে চলে গেলো ওর সই দের সাথে।
কিন্তু এই স্বল্পসময় হরপদ ঠিকই চন্দনাকে দেখেফেলেছিলো।
হরপদ ব্যানার্জি সহসা জিজ্ঞাসা করলো :
- মেয়েটা কে? আগেতো কখনো দেখিনি এই গাঁয়ে।
হরপদের এই কথা শুনেই আমার বুকের ভিতর হু হু করে উঠলো।মনে এক অজানা আকস্মিক ভয় দানা বাধতে শুরু করলো।মনে হলো আমি হারিয়ে ফেলবো চন্দনাকে।
এর ভিতর এক গোমাস্তা বলে উঠলো। ওর নাম চন্দনা।রইস আলীর মেয়ে।
হরপদ: রইস আলী তুমিতো বিয়ে করোনি। মাইয়া পাইলা কই।
গোমেস্তাদের মধ্যে একটা হাসির রোল পরে গেলো। মানুষের দুঃখ কেউ দেখেনা। কিন্তু তামাশা দেখার নেশা এক বড় নেশা।
→আসলে আমার বুবুর মেয়ে।। মা মরা মেয়ে।
: কাইলকার নিয়া আইসো দেখি কি রকম লালন পালন করছো।
আবার হাসিরর রোল পড়লো গোমেস্তা দের মধ্যে।
আমি কোনো কথা না বলে ওখান থেকে বাড়ির পথ ধরলাম।বুবুর ঘটনার পরও ঐ চন্দনার মুখের দিকে তাকিয়ে হরপদ ব্যানার্জির সব প্রতিশোধ ভূলে ছিলাম।
কিন্তু এতো দিন কারর চুপসে থাকা শ্মশানচারী মনে আবার প্রতিশোধের দানা বাধতে থাকলো।
বাবা হয়ে নিজের মেয়ের দিকে কু দৃষ্টি।রক্ত টগবগ করছে। হরপদের এই অত্যাচার আর চলতে দেয়া যাবে না। এসব ভাবতে ভাবতে বাড়ির সামনে এসে পড়লাম।মাথা টখনো টগবগ করছে আমি রাগে কাল নাগের মতো ফুসছি।
দেউরীতে গিয়েই রাগের সহিত হাক ছাড়লাম "চন্দনা"
সাথে সাথে চন্দনা বেরিয়ে এলো।
সজোরে একটা চর মারলাম ওর গালে।এই দীর্ঘ্য পনের বছরের ভিতর একবারও ওর গায়ে হাত তুলিনি।করিনি কোনো শাসনও।আজই তুললাম......নিজের কাছে নিজেকে খুব ছোটো মনে হলো।দেখলাম হাতের পাচটি আঙুলের ছাপ ওর গালে পরে গেছে।ওর চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পরতেছে।।ও দৌরে ঘরের ভিতর চলে গেলে।
আমি প্রিয়দর্শীনিকে হারিয়েছি কিন্তু ওকে হারালে আমি কি নিয়ে বাঁচবো।
তাই স্থির করলাম কালল সূর্যোদয়ের পূর্বেই চন্দনাকে নিয়ে গ্রাম থেকে পালিয়ে যাবো।চন্দনার ঘরে গিয়ে দেখি ও তখনো কাঁদছে।।
গিয়া চন্দনার পাশে বসতেই ও আমার বুকে মাথা গুজে আরো কান্না করতে লাগলো।ওকে স্বান্তনা দেয়ার,ভাষা হারিয়ে ফেলেছি।
আস্তে আস্তে ওকে বললাম চল মা আমরা এই গ্রাম থেকে অন্য কোথায়ও পালিয়ে যাই।
"কেনো?" বলে সেই মায়াবী মুখটা আমার পানে চেয়ে রইলো।একটু আগে ঘটে যাওয়া সমস্ত ঘটনা ওকে খুলে বললাম।
চন্দনা বলল:ও তো বুইড়া। কিন্তু এতো খারাপ কেনে?
এই বার চন্দনাকে ওর মা প্রিয়দর্শীনির সর্বনাশের কাহীনি শুনালাম।ওকে যখন বললাম যে ওর মায়ের সর্বনাশ করেছে ওই হরপদ ব্যানার্জি এবং ওনি চন্দনার বাব।
চন্দবা বলল:আমার বাবা ওই নরপশু কোনোদিনই হতে পারে না।
এসব কথা ছাড় মা। তারাতারি মালপত্র গুছিয়ে নে। কালকে সূর্যদয়ের পূর্বেই এই গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে হবে।
চন্দনা উঠে দাড়ালো ওর মুখে প্রতিশোধের স্পষ্ট চিহ্ণ দেখতে পাচ্ছি।চন্দনা আরো দৃঢ় হয়ে বলল "গ্রাম তো ছাড়বোই তার আগে আমার মায়েরর সর্বনাশের বদলা নিবো।আজ রাতেই হরপদের জীবনের শেষ রাত।"
এরকম বলিস না মা। হরপদ অনেক শক্তিশালী ওর সাথে লাগা আমাদের মতো গরীব মাইনসের খাটে না।
:নাহ বাবাই। ওই নরপিচাশ কে না মারতে পারলে আমার মায়ের আত্মা কোনোদিনও শান্তুি পাবেনা।
ওর কথা শুনে আমার গায়ের রক্ত টগবগ করে ফুটতে ছিলে আর মে পরতেছিলো বুবুর শেষ কথা গুলো ।
→ দেখ মা আমার জীবনে আকড়ে ধরার মতো তুই ছাড়া কেউ নেই।তুই এগুলো ছাড় মা। তারাতারি সব মালপত্র গুছিয়ে ফেল।
:না বাবাই।
চন্দনাকে গ্রাম থেকে পালানোর কথা শেষ পর্যন্ত মানাতে পারলাম না।সে স্থির করলো আজকেই সে জমিদারের রঙ মহলে যাবে।এজন্য কিছু বিষ জোগার করলো যা আজকে জমিদারকে নেশার ঘোরে খাওয়াবে।আমার শত বাধা ও মানলো না। প্রিয়দর্শীনির মতো ও আজ ঘুঙুর পড়লো।ঘুঙুর পরে যখন হাটছে তখন ঝুম ঝুম ঝুম নিপ্পন ধ্বনি ছড়িয়ে পড়লো চারদিক।চন্দনাকে নিয়ে আাশার কারনে জমিদার হররপদ ব্যানার্জি আমাকে কিছু উপঢৌকন দিলো।চন্দনাকল আজ অনেকটা রহস্যময়ী লাগছে। মনে হলো এই চন্দনাকে আমি চিনি না।মনের মধ্যে এক অজানা আতঙ্ক। ও পারবে তো কাজটা করতে। নাকি ওরও প্রিয়দর্শীনির মতো অবস্থা হবে।পৃথিবীর কোনো বাবা হয়তো তার মেয়েকে এমন বিপদে ফেলেনি।মনে মনেনে নিজেকে ধিক্কার দিলাম।ওকে পূর্বের ঘটনা না বলে অন্য কোনো ভাবে বলে কয়ে ওকে নিয়া গ্রাম ছেড়ে পালাতে পারতাম। আমি কাঁদছি যা কেউ শুনতে পেলো না।
সেদিন রংমহলে চন্দনার নিপ্পন ধ্বনি প্রথম বাররের মতো বেজেছিলো যেনো হরপদ ব্যানার্জির বিদায় ঘন্টা।বলে কাদতে ছিলেন রইস আলী।
→দুরে মুয়য়াজ্জিনের আজানের ধ্বনি শোনা যাচ্ছে । সুবেহ সাদিকের অসচ্ছ রবির আলো আমার চোখে এসে পড়ল।আমি ধরমর করে উঠো বসলাম। চারপাশটায় একবার চোখ বোলালাম।একটা ভাঙা বাড়ি চারদিকে ঝোপঝার দেখা যাচ্ছে।ঘোর কাটতেই বুঝলাম এতেক্ষন এখানে ঘুমিয়েছিলাম।গতকাল রাতের কথা মনে পড়লো।আমি একটা দ্বীতল পরিপাটি বাড়িতে ঢুকেছিলাম। তারপর!!!!!দীর্ঘ্য বিস্ময় নিয়ে গতকালকের ঘটনা গুলো মনে করার চেষ্টা করছিলাম।
হ্যা।রইস আলী আর চন্দনা। সব যেনো কেমন ভোজবাজির মতো গায়েব হয়ে গেলো।তারমানে এতোক্ষন স্বপ্ন দেখছিলাম।হঠাৎ খেয়াল হলো কারো পায়ের ঘুঙুরের শব্দ ঝুম ঝুম ঝুম।কই কেউইতো নেই এখানে তাহলে শব্দ কিসের?
এমন আচপাচ ভাবতে ভাবতে মনে পড়লো এতো চন্দনার ঘুঙুরের শব্দ।আচ্ছা চন্দনা র কী হয়েছিলো শেষ পর্যন্ত?আর রইস আলী? মনের ভিতর অনেক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিলো।নাহ এখানে আর সময় নষ্ট করা যাবে না।এই বাড়িটা খুব রহস্য ময়।তাই হর হর করে বাড়িটা থেকে বেরর হলাম। কিন্ত আমি যাবো কীভাবে।সোমনাথদের বাড়িওতো চিনিনা। এদিকে মোবাইলের চার্জ কালকে ট্রেনে বসেই শেষ করে এসেছি।
কিংকর্তব্যবিমুর হয়ে ভাবছি হঠাৎ খেয়া হলো গতকাল রাতে রইস আলীর কথা।হ্যা রইস আলী বলেছিলো "এক গ্রাম পর।মেইন রাস্তা দিয়া সোজা গিয়ে বায়ে সরকার বাড়ি""।
অবশেষে পৌছলাম সমুদের বাড়িতে।চারদিন যাবৎ চললো সমুর দিদির বিয়ের উৎসব।বিয়ের দিন গুলো কেমন একটা ঘোড় এর ভিতর কাটলো।বারবার ভেসে উঠছিলো চন্দনা সেই নিপ্পন ধ্বনি ঝুম ঝুম ঝুম....
বিয়ের অনুষ্ঠান চুকে যাওয়ার পরের দিন সমুকে নিয়ে বেরোলাম গ্রাম টা ঘুরে দেখার জন্য।কিছুদূর হাঁটার পর ওকে জিজ্ঞাস করলাম।
→তোদের গ্রামে দেখার মতো কী কী আছে?
:পুরান আমোলের কয়েকটা মসজিদ,কিছু স্থাপনা, দুইটা বড় বড় দীঘি এই।
→রাজ প্রাসাদ ট্রাসাদ নাই?
: আছে একটা জমিদার বাড়ি অনেক আগের। তবে ওইখানে নাকি ভূত পেত্নীর আস্থানা হয়ে গেছে। তাই লোকজন তেমন একটা যায় না ঐ দিক টায়।
→চল আজকে ওই খানেই যাবো।
:না ভাই পরে ভুতে ঘাড় মটকালে।
→দুর হাদারাম চল।
:আচ্ছা।
কিছুক্ষন পর
:এই ততাজ আমার না ভয় লাগতেছে।
→আরে কোনা সমস্যা নাই।
:বলছিস?!
→আরে চলতো আমি থাকতে তোর কোনো ভরসা নাই।
:এমনে বলিস না।
→আচ্ছা চলতো এইবার।
:ওকে যাওয়া যাক।
আবারও ডুকলাম সেই দ্বীতল মনরম বড়িতে।তবে এইটা এখোন বন জঙ্গলে ভর্তি।
ঘুরে ঘুরে আমাকে সব দেখাতে থাকলো সমু।
আমি মনে তখনো সেই চন্দনার নিপ্পন ধ্বনি ঝুম ঝুম ঝুম।আচ্ছা চন্দনার কী হয়েছিলো??
চন্দনাকে নিয়ে এইরকম নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিলো মনে।
আমি বললাম→বাহ অনেক সুন্দর বাড়িটা। জমিদার মনে হয় খুব শৌখিন ছিলেন।
সমু::হুম। তবে অত্যাচারী এবং নারী লোভী
→কী বলছিস এই গুলো।তোর কথা বিশ্বাস করি না।
: জানিস এই জমমিদার রংমহলে যেদিন মারা যায় সেইদিন এর পার্শ্বে একটা নারীর মৃতদেহ ও পাওয়া গিয়েছিলো।
→বলিস কি? ওই মেয়াটাই মেরেছিলো জমিদারকে?
:মুরব্বিরা তাই বলে তবে
→তবে?
:এই দুটি শবদেহের পাশে আরেকটা লোক ছিলো।নাম রইস আলী।
→ও তারপর।
:লোকজন ওই লোকটিকে কারাগারে পুরে দেয়এবং তকে একটা বদ্ধ ঘরে আটকে রাখা হয়। কোনা খাবার দেয়া হতো না তাকে। সাত দিনের দিন সেখানেই রইস আলী মারা যায়।
আমার আরর বুজতে বাকী রইলো না। কালকে রাতে যে রইস আলী আর চন্দনার কথা শুননেছিলাম ওরা ভিন্ন জগতের মানুষ। হরপদ ব্যানার্জীকে চন্দনা তাহলে মারতে পেরেছিলো।রইস আলীর বুবু প্রিয়দর্শীনির আত্মা কিছুটা হলেলেও স্বস্তি পেয়েছিলো।
:কিরে সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে ফিরতে হবে না?
সমুর কথায় আবার সম্বিত ফিরে পেলাম.
→হ্যা চল এইবার যাওয়া যাক।
ফিরে আসছিলাম সেই অভিশপ্ত জমিদার বাড়ি থেকে।গেটের কাছে আসতেই শুনতে পেলাম সেই চিরচেনা ঘুঙুরের শব্দ। ঝুম ঝুম ঝুম।
এতো চন্দনার সেই ঘুঙুর যা তকে জীবন মৃত্যুর রহস্যের ধাঁধার ভিতর নিয়ে গিয়েছিলো।
সন্ধ্যা নামছে তাই বাড়ির দিকে রওয়ানা হলাম।আবার কানে ভেসে আসলো সেই শব্দ
"ঝুম ঝুম ঝুম"
হ্যা।রইস আলী আর চন্দনা। সব যেনো কেমন ভোজবাজির মতো গায়েব হয়ে গেলো।তারমানে এতোক্ষন স্বপ্ন দেখছিলাম।হঠাৎ খেয়াল হলো কারো পায়ের ঘুঙুরের শব্দ ঝুম ঝুম ঝুম।কই কেউইতো নেই এখানে তাহলে শব্দ কিসের?
এমন আচপাচ ভাবতে ভাবতে মনে পড়লো এতো চন্দনার ঘুঙুরের শব্দ।আচ্ছা চন্দনা র কী হয়েছিলো শেষ পর্যন্ত?আর রইস আলী? মনের ভিতর অনেক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিলো।নাহ এখানে আর সময় নষ্ট করা যাবে না।এই বাড়িটা খুব রহস্য ময়।তাই হর হর করে বাড়িটা থেকে বেরর হলাম। কিন্ত আমি যাবো কীভাবে।সোমনাথদের বাড়িওতো চিনিনা। এদিকে মোবাইলের চার্জ কালকে ট্রেনে বসেই শেষ করে এসেছি।
কিংকর্তব্যবিমুর হয়ে ভাবছি হঠাৎ খেয়া হলো গতকাল রাতে রইস আলীর কথা।হ্যা রইস আলী বলেছিলো "এক গ্রাম পর।মেইন রাস্তা দিয়া সোজা গিয়ে বায়ে সরকার বাড়ি""।
অবশেষে পৌছলাম সমুদের বাড়িতে।চারদিন যাবৎ চললো সমুর দিদির বিয়ের উৎসব।বিয়ের দিন গুলো কেমন একটা ঘোড় এর ভিতর কাটলো।বারবার ভেসে উঠছিলো চন্দনা সেই নিপ্পন ধ্বনি ঝুম ঝুম ঝুম....
বিয়ের অনুষ্ঠান চুকে যাওয়ার পরের দিন সমুকে নিয়ে বেরোলাম গ্রাম টা ঘুরে দেখার জন্য।কিছুদূর হাঁটার পর ওকে জিজ্ঞাস করলাম।
→তোদের গ্রামে দেখার মতো কী কী আছে?
:পুরান আমোলের কয়েকটা মসজিদ,কিছু স্থাপনা, দুইটা বড় বড় দীঘি এই।
→রাজ প্রাসাদ ট্রাসাদ নাই?
: আছে একটা জমিদার বাড়ি অনেক আগের। তবে ওইখানে নাকি ভূত পেত্নীর আস্থানা হয়ে গেছে। তাই লোকজন তেমন একটা যায় না ঐ দিক টায়।
→চল আজকে ওই খানেই যাবো।
:না ভাই পরে ভুতে ঘাড় মটকালে।
→দুর হাদারাম চল।
:আচ্ছা।
কিছুক্ষন পর
:এই ততাজ আমার না ভয় লাগতেছে।
→আরে কোনা সমস্যা নাই।
:বলছিস?!
→আরে চলতো আমি থাকতে তোর কোনো ভরসা নাই।
:এমনে বলিস না।
→আচ্ছা চলতো এইবার।
:ওকে যাওয়া যাক।
আবারও ডুকলাম সেই দ্বীতল মনরম বড়িতে।তবে এইটা এখোন বন জঙ্গলে ভর্তি।
ঘুরে ঘুরে আমাকে সব দেখাতে থাকলো সমু।
আমি মনে তখনো সেই চন্দনার নিপ্পন ধ্বনি ঝুম ঝুম ঝুম।আচ্ছা চন্দনার কী হয়েছিলো??
চন্দনাকে নিয়ে এইরকম নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিলো মনে।
আমি বললাম→বাহ অনেক সুন্দর বাড়িটা। জমিদার মনে হয় খুব শৌখিন ছিলেন।
সমু::হুম। তবে অত্যাচারী এবং নারী লোভী
→কী বলছিস এই গুলো।তোর কথা বিশ্বাস করি না।
: জানিস এই জমমিদার রংমহলে যেদিন মারা যায় সেইদিন এর পার্শ্বে একটা নারীর মৃতদেহ ও পাওয়া গিয়েছিলো।
→বলিস কি? ওই মেয়াটাই মেরেছিলো জমিদারকে?
:মুরব্বিরা তাই বলে তবে
→তবে?
:এই দুটি শবদেহের পাশে আরেকটা লোক ছিলো।নাম রইস আলী।
→ও তারপর।
:লোকজন ওই লোকটিকে কারাগারে পুরে দেয়এবং তকে একটা বদ্ধ ঘরে আটকে রাখা হয়। কোনা খাবার দেয়া হতো না তাকে। সাত দিনের দিন সেখানেই রইস আলী মারা যায়।
আমার আরর বুজতে বাকী রইলো না। কালকে রাতে যে রইস আলী আর চন্দনার কথা শুননেছিলাম ওরা ভিন্ন জগতের মানুষ। হরপদ ব্যানার্জীকে চন্দনা তাহলে মারতে পেরেছিলো।রইস আলীর বুবু প্রিয়দর্শীনির আত্মা কিছুটা হলেলেও স্বস্তি পেয়েছিলো।
:কিরে সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে ফিরতে হবে না?
সমুর কথায় আবার সম্বিত ফিরে পেলাম.
→হ্যা চল এইবার যাওয়া যাক।
ফিরে আসছিলাম সেই অভিশপ্ত জমিদার বাড়ি থেকে।গেটের কাছে আসতেই শুনতে পেলাম সেই চিরচেনা ঘুঙুরের শব্দ। ঝুম ঝুম ঝুম।
এতো চন্দনার সেই ঘুঙুর যা তকে জীবন মৃত্যুর রহস্যের ধাঁধার ভিতর নিয়ে গিয়েছিলো।
সন্ধ্যা নামছে তাই বাড়ির দিকে রওয়ানা হলাম।আবার কানে ভেসে আসলো সেই শব্দ
"ঝুম ঝুম ঝুম"



No comments