Life is a story makes yours the best seller

অন্ধকার জগৎ পর্ব ১

রুমী বরাবরই একেবারে সাধারণ ছেলে। সাধারণ ছেলেদের মতো তাকে কেমন দেখাচ্ছে সে নিয়ে তার মাথাব্যথার শেষ ছিল না। ক্লাসের ফিটফাট ছেলেদের দেখে তাই তার ভিতরে হীনমন্যতা জেগে উঠতো। ঘুরেফিরে দুটি প্যান্ট পরেই তাকে ক্লাসে আসতে হয়, ব্যাপারটা অন্যেরা লক্ষ করছে কি না সে নিয়ে তার দুশ্চিন্তার সীমা নেই।
টিউশনির টাকা পেয়ে সে যখন হাল ফ্যাশনের চওড়া কলারওয়ালা নতুন একটা শার্ট তৈরি করল তার ভিতরে তখন আনন্দের একটা জোয়ার বয়ে গিয়েছিল। সে সেই শার্ট পরে দোকানের সামনে দিয়ে হাঁটার সময় সাবধানে দোকানের আয়নায় নিজেকে লক্ষ করতো। তার চেহারা মোটামুটি ভালো এ নিয়ে সে খুব সচেতন, গায়ের রংটা আরেকটু ফর্সা হলে তার আর কোনো দুঃখ থাকতো না। অন্যদের দেখাদেখি সে তার চুলকে কান ঢেকে ঝুলে পড়তে দিয়েছে, তাই সেগুলিকে আগের থেকে বেশি যত্ন করতে হয়।
কাছে-পিঠে কেউ না থাকলে আজকাল সে তার পকেট থেকে ছোট একটা চিরুনি বের করে অনেক যত্ন করে চুল ঠিক করে নেয়। তার বয়সী অন্য যে কোনো ছেলেদের মতো রুমীরও মেয়েদের নিয়ে খুব আগ্রহ। রাস্তাঘাটে কোথাও কোনো মেয়ে তাকে আলাদা করে লক্ষ করে কি না সেটা জানার তার খুব কৌতূহল। কখনো কোনো কারণে কোনো মেয়ে ঘুরে দ্বিতীয়বার তার দিকে তাকালে সে সারাদিন ঘটনাটি ভুলতে পারে না।
এমনিতে সে খুব মুখচোরা, কোনোদিন যেচে কোনো মেয়ের সাথে কথা বলবে এরকম সাহস নেই; অথচ প্রায়ই সে কল্পনা করে একটা আধুনিকা মেয়ে তার জন্যে পাগল হয়ে আছে। প্রতিবার নতুন টিউশনি নেবার আগে সে মনে মনে আশা করে একটি সুন্দরী মেয়েকে পড়াবে, কিন্তু কখনোই তা হয়ে ওঠেনি। কে জানে, সুন্দরী মেয়েদের বাবারা হয়তো উঠতি বয়সের কলেজের একটা ছেলের হাতে মেয়েকে অঙ্ক কষতে দেওয়ার সাহস পান না!
রুমীর সবচেয়ে বড় সমস্যা তার নিজেকে নিয়ে। সে প্রাণপণ চেষ্টা করে কেউ যেন বুঝতে না পারে সে মফস্বলের ছেলে।
ক্লাসের ফিটফাট ইংরেজি কথা বলা ছেলেদের সে মুগ্ধ বিস্ময়ে লক্ষ করে। শুদ্ধ ইংরেজিতে সে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লিখে যেতে পারে কিন্তু মুখে মুখে সে ইংরেজিতে একটা কথা পর্যন্ত বলতে পারে না। চেষ্টা করে দেখেছে, তার গ্রাম্য ক্লাস-টিচারের সুর এসে পড়ে। বৃদ্ধ ক্লাস-টিচারের তাকে নিয়ে যত গর্বই থাকুক না কেন,রুমীর নিজেকে নিয়ে লজ্জার সীমা নেই।
একসময় ফিটফাট ছেলেদের সাথে সে মেশার চেষ্টা করে দেখেছে, কিন্তু তাদের প্রচ্ছন্ন অবহেলা বুঝতে পেরে সে নিজের মাঝে গুটিয়ে গেছে। মাঝে মাঝে রুমী কল্পনা করে সে বিদেশ থেকে অনেক বিখ্যাত হয়ে ফিরে এসেছে, আর এইসব ফিটফাট ছেলেরা তার সাথে দেখা করতে এসেছে। সে যেন বিশুদ্ধ সাহেবি ইংরেজিতে বলছে : তোমাদের দেখেছি দেখেছি মনে হচ্ছে, কিন্তু ঠিক চিনতে পারলাম না তো।
রুমীর এই ধরনের অনেক কল্পনা, সাধারণ ছেলেদের মতো তার কল্পনাগুলিও সাধারণ। মোহ আর উচ্চাশা তাকে বাঁচিয়ে রাখে। যা কিছু বিদেশি তাতেই আজকাল তার প্রচণ্ড বিশ্বাস। নিজের দেশের রাজনীতি পর্যন্ত সে বিদেশি সাংবাদিকদের আলোচনা পড়ে শিখতে চেষ্টা করে।
দেশকে নিয়ে সে আজকাল সত্যি সত্যি হতাশাগ্রস্ত, বিদেশিরা কীভাবে উন্নতি করে ফেলছে আর এ দেশের লোকেরা কীভাবে নিজেদের সর্বনাশ করছে এ ব্যাপারে আজকাল সে বুদ্ধিজীবীদের সাথে একমত। একবার দেশের বাইরে যেতে পারলে সে আর কোনোদিন ফিরে আসবে না-এরকম একটা ধারণা আস্তে আস্তে তার ভিতরে গড়ে উঠছে।
সার্থক জীবনের অর্থ বিদেশে প্রতিষ্ঠা, এ ব্যাপারে তার আজকাল আর কোনো সন্দেহ নেই। এই আশা নিয়েই সে আস্তে আস্তে বড় হয়ে উঠছিল, কিন্তু একদিন সেটাতে একটা চোট খেয়ে গেল।
তখন পরীক্ষার মাস দুয়েক বাকি, পড়াশোনার খুব চাপ। বিকেলে একটা টিউশনি করে রুমী খুব ক্লান্ত হয়ে পড়ে। ছাত্রটার আলাদা পড়ার ঘর নেই, কাজেই মধ্যবিত্তের সংসারের ঠিক মাঝখানে বসে থেকে তাকে পড়াতে হয়। দৈনন্দিন তিক্ত ঘটনাবলির মাঝে বসে থেকে প্রায়-নির্বোধ একটি ছেলেকে এক জিনিস দশবার করে বোঝাতে তার দুই ঘণ্টা সময়কে দশ ঘণ্টার মতো দীর্ঘ মনে হয়। তার ওপর কোনোদিনই তাকে কিছু খেতে দেয় না, প্রচণ্ড ক্ষুধা নিয়ে সে উঠে আসে।
চা খেয়ে খিদে নষ্ট করার জন্যে সে বিশ্ববিদ্যালয়ের এলাকার কাছাকাছি একটা চায়ের দোকানে যেতো। আজকাল সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা এসে আড্ডা জমায়। তাদের দেখা একটা মজার কাজ। একজন-দুজন রুমীর মনের মতো বের হয়ে পড়ে, তাদের সে মুগ্ধ বিস্ময় নিয়ে লক্ষ করে সময় কাটিয়ে দেয়। নিজের অগোচরে সে তাদের মতো হওয়ার চেষ্টা করে-কথাবার্তায়, হাসিতে, পোশাকে, হাঁটার ভঙ্গিতে।
সেদিন বৃষ্টি বলে চায়ের দোকানে ভিড় কম। রুমী জানালার পাশে একটা চা, একটা শিঙ্গাড়া নিয়ে আরাম করে বসেছে। তার ঠিক পাশেই একজন গভীর মনোযোগ দিয়ে গাঁজাভরা একটা সিগারেট নির্বিকারভাবে টেনে যাচ্ছে। সামনের টেবিলে বসে দুজন তর্ক করছে-বিষয়বস্তু রুমীর জ্ঞানের বাইরে, কোনো একজন আমেরিকান অর্থনীতিবিদের ব্যক্তিগত বিশ্বাসের যৌক্তিকতা। তর্ক উত্তপ্ত হতেই কথাবার্তায় ইংরেজি বের হয়ে আসতে থাকে। কি সুন্দর, উচ্চারণ, কি সুন্দর কথা বলার ভঙ্গি, কি চমৎকার শব্দ চয়ন! রুমী মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে।
দাদা কি করে আপনাদের?
রুমী গলার স্বর শুনে চমকে তাকায়। গাঁজা খাওয়া লোকটি লাল চোখে কিন্তু মুখে একটা হাসি নিয়ে তর্করত ছেলে দুটিকে জিজ্ঞেস করছে। ছেলে দুটি থতমত খেয়ে থেমে গিয়ে একজন আরেকজনের মুখের দিকে তাকাল। প্রশ্নটি ঠিক বুঝতে পারেনি ভেবে লোকটি গলা উঁচিয়ে আবার জিজ্ঞেস করল, আপনাদের দাদারা কি করতেন?
এক্সকিউজ মি?
আপনার দাদা, মানে আপনার বাবার বাবার বাবা কি করতেন?
কেন?
গরিব ছিলেন কি না? চাষা, কি গোয়ালা, কি মাঝি?
হোয়াট? একজনের ফর্সা মুখ টকটকে লাল হয়ে ওঠে, হোয়াট ডু ইউ মিন?
আহা-হা-হা রাগ করেন কেন? আমি শুধু জানতে চাইছি আপনাদের দাদারা কি করতেন?
কেন? ইটস নান অব ইওর বিজনেস। আমার দাদা যা খুশি করুক তাতে আপনার কি?
লোকটার মুখে তখনো হাসি। পান খাওয়া দাঁত বের করে বলল, বলতে না চাইলে বলবেন না। লজ্জা করলে বলবেন কেন?
একটা বড় ঝগড়া লেগে যাবার উপক্রম, অন্য ছেলেটা কোনোমতে থামিয়ে দিয়ে তাকে টেনে নিয়ে বের হয়ে গেল। গাঁজা খাওয়া লোকের সাথে ঝগড়া করে কখনো, কি বলতে গিয়ে কি বলেছে!
চলবে
পরের পর্ব আজ রাত ৯টা বাজে দিবো!
অপেক্ষায় থাকুন!

No comments

Theme images by imagedepotpro. Powered by Blogger.